গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে বাচ্চার কি ক্ষতি হয়?

Published on June 30, 2026
Share:
ডায়াবেটিস কেয়ার
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে বাচ্চার কি ক্ষতি হয়?

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে বাচ্চার কি ক্ষতি হয়?

গর্ভাবস্থায় উচ্চ শর্করা শিশুর অস্বাভাবিক ওজন, অকাল জন্ম ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে সঠিক খাদ্যভ্যাস, নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ভয় না পেয়ে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকুন।

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস কী?

গর্ভাবস্থায় প্রথমবারের মতো রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলে তাকে জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস বলে। এটি মূলত ঘটে শরীরের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স প্রক্রিয়ার কারণে। গর্ভকালীন সময়ে প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল থেকে বিশেষ কিছু হরমোন নিঃসৃত হয়, যা রক্তে শর্করার ভারসাম্য (Blood sugar imbalance) নষ্ট করতে পারে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। 

সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৪–২৮ সপ্তাহের মধ্যে এই সমস্যাটি নির্ণয় করা হয়।বর্তমানে বাংলাদেশে এই সমস্যাটি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর প্রধান কারণ আমাদের অনিয়ন্ত্রিত লাইফস্টাইল এবং অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাদ্যাভ্যাস। 

প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব গর্ভবতী মায়েদের এই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে মা ও শিশু উভয়কেই সুস্থ রাখা সম্ভব।


মায়ের রক্তে সুগার বা গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে তা সরাসরি গর্ভস্থ শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে।

মায়ের ডায়াবেটিস কেন বাচ্চার উপর প্রভাব ফেলে

মায়ের রক্তে সুগার বা গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে তা সরাসরি গর্ভস্থ শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে। এর প্রধান কারণ হলো প্লাসেন্টা (Placenta) বা গর্ভফুল। মায়ের রক্ত থেকে অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্লাসেন্টার মাধ্যমে খুব সহজেই বাচ্চার শরীরে পৌঁছে যায়। 

তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, ইনসুলিন কিন্তু প্লাসেন্টা পার হতে পারে না।যখন শিশুর শরীরে এই অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রবেশ করে, তখন তার ছোট্ট অগ্ন্যাশয় (Pancreas) সেই সুগার সামলাতে প্রচুর পরিমাণে ইনসুলিন উৎপাদন শুরু করে। ইনসুলিন মূলত একটি গ্রোথ হরমোন হিসেবে কাজ করে। 

ফলে বাচ্চার শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমে এবং ফিটাল গ্রোথ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে 'মাইক্রোসোমিয়া' বলা হয়। এই প্রক্রিয়াটি বাচ্চার স্বাভাবিক মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বাচ্চার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ; কারণ এটি প্রসবকালীন জটিলতা তৈরি করে এবং জন্মের পর শিশুর রক্তে হঠাৎ সুগার কমে যাওয়া (Hypoglycemia) বা শ্বাসকষ্টের মতো দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণ

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস বা জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস শনাক্ত করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর শুরুতে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখায় না। অনেক সময় গর্ভবতী মায়েরা সাধারণ প্রেগন্যান্সি অস্বস্তি মনে করে এগুলো এড়িয়ে যান। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি:

  • অতিরিক্ত তৃষ্ণা: বারবার পানি পান করার পরেও মুখ বা গলা শুকিয়ে আসা।

  • ঘন ঘন প্রস্রাব: বিশেষ করে রাতের বেলায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশিবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া।

  • অস্বাভাবিক ক্লান্তি: পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরেও শরীরে প্রচণ্ড দুর্বলতা বা ক্লান্তি অনুভব করা।

  • ঝাপসা দেখা: হঠাৎ করে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া বা চোখের ফোকাসে সমস্যা হওয়া।

মনে রাখবেন, শুধুমাত্র শারীরিক লক্ষণের ওপর নির্ভর করে এটি নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। গর্ভাবস্থার ২৪–২৮ সপ্তাহের মধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে Pregnancy glucose test (যেমন: OGTT) করার মাধ্যমেই নিশ্চিতভাবে এই রোগ ডায়াগনোসিস (Diagnosis) করা যায়।

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ধরা পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক জীবনযাত্রার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

কিভাবে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করবেন

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ধরা পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক জীবনযাত্রার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নিচে তিনটি প্রধান কৌশল আলোচনা করা হলো:

১. সঠিক খাবার নির্বাচন: বাঙালি খাদ্যাভ্যাসে ভাতের আধিক্য বেশি থাকে, যা দ্রুত রক্তে চিনি বাড়ায়। তাই সুষম খাবার নিশ্চিত করতে ভাতের পরিমাণ কমিয়ে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি ও প্রোটিন (মাছ, মাংস, ডাল বা ডিম) যোগ করুন। সাদা চালের বদলে লাল চাল বা লাল আটার মতো হোল গ্রেইন বেছে নিন। মিষ্টি জাতীয় খাবার ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত চা বা শরবত এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।

২. নিয়মিত হালকা ব্যায়াম: রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে শারীরিক সক্রিয়তা অত্যন্ত জরুরি। ভারী কাজ না করে প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ মিনিট হাঁটা বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নিরাপদ Pregnancy exercise করতে পারেন। ঘরের ভেতর হালকা হাত-পা নাড়াচাড়া করা ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।

৩. নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ: বাড়িতে একটি গ্লুকোমিটার রেখে নিয়মিত বিরতিতে Blood sugar monitoring করুন এবং তা লিখে রাখুন। প্রতিটি Routine pregnancy check-up-এ আপনার রিপোর্ট ডাক্তারকে দেখান। যদি ডায়েট ও ব্যায়ামে সুগার নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে মা ও শিশুর নিরাপত্তার স্বার্থে ডাক্তার Insulin therapy দেওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন।

সঠিক সময়ে সচেতনতা এবং নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস গর্ভাবস্থাকে করে তুলতে পারে নিরাপদ ও জটিলতামুক্ত।

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস থাকলে কি স্বাভাবিক ডেলিভারি সম্ভব?

অনেকেরই ধারণা গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস বা জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস থাকলে সিজার বাধ্যতামূলক। তবে সত্য হলো, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে অনেক ক্ষেত্রে Normal delivery সম্ভব। যদি গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক থাকে এবং মা ও শিশুর কোনো জটিলতা না থাকে, তবে চিকিৎসকরা স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টাই করেন।

তবে, ডায়াবেটিসের কারণে Baby weight বা বাচ্চার ওজন অস্বাভাবিক বেশি হলে (ম্যাক্রোসোমিয়া), প্রসবকালীন ঝুঁকি এড়াতে C-section বা সিজারের প্রয়োজন হতে পারে। এই সিদ্ধান্ত নিতে সঠিক Doctor monitoring অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

গর্ভাবস্থার শেষ কয়েক সপ্তাহ নিয়মিত Prenatal check-up এর মাধ্যমে বাচ্চার পজিশন, ওজন এবং হার্টবিট পর্যবেক্ষণ করতে হয়। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং যথাযথ চিকিৎসা পরিকল্পনা থাকলে একজন ডায়াবেটিক মা-ও একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক ডেলিভারির আশা করতে পারেন।

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস থাকলে নিয়মিত চেকআপের পাশাপাশি কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে একে অবহেলা করা উচিত নয়:

কখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস থাকলে নিয়মিত চেকআপের পাশাপাশি কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে একে অবহেলা করা উচিত নয়:

  • ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণহীনতা: যদি রক্তে শর্করার মাত্রা বা Blood sugar খুব বেশি হয়ে যায় (যা ডায়েটেও কমছে না)।

  • বাচ্চার নড়াচড়া কমে যাওয়া: যদি লক্ষ্য করেন গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক নড়াচড়া আগের চেয়ে কমে গেছে।

  • শারীরিক অস্বস্তি: হঠাৎ প্রচণ্ড মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা অনুভব করা।

  • অস্বাভাবিক ফোলাভাব: হাত-পা বা মুখ হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া এবং সাথে তীব্র মাথাব্যথা।

জরুরি পরামর্শ : উপরে উল্লেখিত যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে আপনার গাইনোকোলজিস্ট বা নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করুন। গর্ভাবস্থায় সচেতনতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত মা ও শিশু—উভয়কেই বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে।

FAQ – গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন

হ্যাঁ, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে বাচ্চার অতিরিক্ত ওজন বা অকাল জন্মের ঝুঁকি থাকে, যা সঠিক ডায়েট ও চেকআপে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সাধারণত এটি স্থায়ী নয়, তবে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকা নারীদের ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে।
সুষম খাবার গ্রহণ, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সুস্থ জীবনধারা বজায় রাখলে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বাচ্চার ব্লাড সুগার কম বা শ্বাসকষ্ট থাকলে জন্মের পর তাকে NICU-তে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে, যা গর্ভকালীন সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখলে এড়ানো সম্ভব।

Still have questions?

Designed & developed byZeroX— crafting digital commerce experiences